, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
ঈদকে সামনে রেখে গাবতলীতে দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, জিম্মি ঘরমুখো যাত্রীরা বীর মুক্তিযোদ্ধা এম. ওয়াজেদ আলী হত্যা মামলার রায় ঘোষণা, প্রধান আসামির মৃত্যুদণ্ড রংপুরে বিএডিসি’র বীজ ডিলার প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত রংপুরে কোরবানী উপলক্ষে নূর ক্যাটল ফার্মে গরু বিক্রয় শুরু প্রেসক্লাব চত্বরে আগামীকাল গণঅবস্থান কর্মসূচি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচন ২০২৬–২০২৭: সদস্য পদে লড়ছেন অ্যাডভোকেট মোঃ জিয়া উদ্দিন মিয়া দিগন্ত নিউজ ২৪-এর উপদেষ্টা এডভোকেট পলাশ কান্তি নাগের জন্মদিন আজ রেলযাত্রায় আতঙ্ক: চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে নেই কার্যকর ব্যবস্থা মহান মে দিবসের শুভেচ্ছা আত্মহত্যা নাকি চাপের পরিণতি? মিমোর মৃত্যুর পেছনে ঢাবির শিক্ষক সিন্ডিকেটের ছায়া

আত্মহত্যা নাকি চাপের পরিণতি? মিমোর মৃত্যুর পেছনে ঢাবির শিক্ষক সিন্ডিকেটের ছায়া

  • প্রকাশের সময় : ১১:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
  • ২৪৪ পড়া হয়েছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর (২৬) ঝুলন্ত মরদেহ বাড্ডার বাসা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তীকে আটক করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে সুদীপের ফোনের কল হিস্ট্রি ডিলিট করার প্রমাণ মিলেছে। মিমোর চিরকুটে সুদীপ চক্রবর্তী ও সহপাঠী উম্মে হানির নাম এবং শিক্ষককে টাকা ও উপহার ফেরত দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

মিমোর মৃত্যুর পর বিভাগটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরিত হতে শুরু করেছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতা, একাডেমিক নিপীড়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চরম অবহেলাকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, বিভাগে শিক্ষক হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষকদের অসহযোগিতামূলক আচরণ শিক্ষার্থীদের জন্য এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে।

বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্র্যাকটিক্যাল ও থিওরি কোর্সে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মত প্রকাশের সুযোগ খুবই সীমিত। শিক্ষকদের নির্দেশনার বাইরে কিছু করলেই ‘মার্কড’ হতে হয়, যার প্রভাব পুরো একাডেমিক জীবনে পড়ে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভাগে অন্তত তিন শিক্ষক দম্পতি কর্মরত। বর্তমান চেয়ারম্যান তামান্না সিগমা ও সাবেক চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান লিওন যেমন দম্পতি, তেমনি ওয়াহিদা মল্লিক জলি ও রহমত আলীও বিভাগে রয়েছেন। এমনকি আরেক সাবেক চেয়ারম্যান যাকে শিক্ষার্থীরা ‘ইয়াং স্যার’ ডাকেন, তিনি নিজের শিক্ষার্থীকে বিয়ে করেছেন। শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিভাগীয় সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতার ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং একটি বিশেষ ‘বলয়’ তৈরি করে রাখে, যে বলয়ের বলি হতে হয় বিভাগের শিক্ষার্থীদের।

ওই শিক্ষার্থী জানান, বিভাগে উপস্থিতির ক্ষেত্রেও প্রচণ্ড বৈষম্য করা হয়। শিক্ষকদের সাথে সুসম্পর্ক থাকলে কম উপস্থিতিতেও ছাড় পাওয়া যায়, আর সম্পর্ক খারাপ হলে পর্যাপ্ত উপস্থিতিতেও সমস্যা তৈরি করা হয়। এমনকি আগে এক শিক্ষকের সাথে ছাত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে। মিমোর সুইসাইড নোটের ভাষা ও প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি কেবল প্রেমঘটিত বলে সরলীকরণ করা ঠিক হবে না; এর নেপথ্যে গভীর কোনো সংকট রয়েছে। সেটি প্রশাসনকে খুঁজে দেখতে হবে।

বিভাগের চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমা বলেন, ‘সকালে এক অ্যালামনাই ও শিক্ষকের মাধ্যমে মিমোর খবরটি জানতে পারি এবং আমরা দ্রুত বাড্ডার বাসায় যাই। চিরকুটটি আমরা সরাসরি দেখিনি, তবে পুলিশ ও লোকমুখে দুজনের নাম শোনার কথা জেনেছি। বিভাগের পরিবেশ নিয়ে সিন্ডিকেট বা অনিয়মের যেসব অভিযোগ উঠেছে তার কোনো সত্যতা নেই। শিক্ষক দম্পতিদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন এবং আমি নিজেও যোগ্যতার ভিত্তিতেই এখানে এসেছি। ২০২২ সালের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তখন অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত এবং সুষ্ঠু তদন্তে প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’

তদন্তের বিষয়ে ডিএমপির বাড্ডা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ আসুজ্জামান জানান, ঘটনাটি এখনো প্রাথমিক তদন্তাধীন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করে প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। মিমোর সুইসাইড নোট এবং ডিজিটাল প্রমাণগুলো যাচাই করা হচ্ছে। মামলার প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান।

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদের সাথে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

জনপ্রিয়

ঈদকে সামনে রেখে গাবতলীতে দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, জিম্মি ঘরমুখো যাত্রীরা

আত্মহত্যা নাকি চাপের পরিণতি? মিমোর মৃত্যুর পেছনে ঢাবির শিক্ষক সিন্ডিকেটের ছায়া

প্রকাশের সময় : ১১:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর (২৬) ঝুলন্ত মরদেহ বাড্ডার বাসা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তীকে আটক করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে সুদীপের ফোনের কল হিস্ট্রি ডিলিট করার প্রমাণ মিলেছে। মিমোর চিরকুটে সুদীপ চক্রবর্তী ও সহপাঠী উম্মে হানির নাম এবং শিক্ষককে টাকা ও উপহার ফেরত দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

মিমোর মৃত্যুর পর বিভাগটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরিত হতে শুরু করেছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতা, একাডেমিক নিপীড়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চরম অবহেলাকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, বিভাগে শিক্ষক হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষকদের অসহযোগিতামূলক আচরণ শিক্ষার্থীদের জন্য এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে।

বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্র্যাকটিক্যাল ও থিওরি কোর্সে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মত প্রকাশের সুযোগ খুবই সীমিত। শিক্ষকদের নির্দেশনার বাইরে কিছু করলেই ‘মার্কড’ হতে হয়, যার প্রভাব পুরো একাডেমিক জীবনে পড়ে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভাগে অন্তত তিন শিক্ষক দম্পতি কর্মরত। বর্তমান চেয়ারম্যান তামান্না সিগমা ও সাবেক চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান লিওন যেমন দম্পতি, তেমনি ওয়াহিদা মল্লিক জলি ও রহমত আলীও বিভাগে রয়েছেন। এমনকি আরেক সাবেক চেয়ারম্যান যাকে শিক্ষার্থীরা ‘ইয়াং স্যার’ ডাকেন, তিনি নিজের শিক্ষার্থীকে বিয়ে করেছেন। শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিভাগীয় সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতার ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং একটি বিশেষ ‘বলয়’ তৈরি করে রাখে, যে বলয়ের বলি হতে হয় বিভাগের শিক্ষার্থীদের।

ওই শিক্ষার্থী জানান, বিভাগে উপস্থিতির ক্ষেত্রেও প্রচণ্ড বৈষম্য করা হয়। শিক্ষকদের সাথে সুসম্পর্ক থাকলে কম উপস্থিতিতেও ছাড় পাওয়া যায়, আর সম্পর্ক খারাপ হলে পর্যাপ্ত উপস্থিতিতেও সমস্যা তৈরি করা হয়। এমনকি আগে এক শিক্ষকের সাথে ছাত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে। মিমোর সুইসাইড নোটের ভাষা ও প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি কেবল প্রেমঘটিত বলে সরলীকরণ করা ঠিক হবে না; এর নেপথ্যে গভীর কোনো সংকট রয়েছে। সেটি প্রশাসনকে খুঁজে দেখতে হবে।

বিভাগের চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমা বলেন, ‘সকালে এক অ্যালামনাই ও শিক্ষকের মাধ্যমে মিমোর খবরটি জানতে পারি এবং আমরা দ্রুত বাড্ডার বাসায় যাই। চিরকুটটি আমরা সরাসরি দেখিনি, তবে পুলিশ ও লোকমুখে দুজনের নাম শোনার কথা জেনেছি। বিভাগের পরিবেশ নিয়ে সিন্ডিকেট বা অনিয়মের যেসব অভিযোগ উঠেছে তার কোনো সত্যতা নেই। শিক্ষক দম্পতিদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন এবং আমি নিজেও যোগ্যতার ভিত্তিতেই এখানে এসেছি। ২০২২ সালের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তখন অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত এবং সুষ্ঠু তদন্তে প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’

তদন্তের বিষয়ে ডিএমপির বাড্ডা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ আসুজ্জামান জানান, ঘটনাটি এখনো প্রাথমিক তদন্তাধীন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করে প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। মিমোর সুইসাইড নোট এবং ডিজিটাল প্রমাণগুলো যাচাই করা হচ্ছে। মামলার প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান।

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদের সাথে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।